চেকপোস্টের সামনেই বালু লুট, সুনাই নদীতে কার ইশারায় চলছে সিন্ডিকেট?

চেকপোস্টের সামনেই বালু লুট, সুনাই নদীতে কার ইশারায় চলছে সিন্ডিকেট?

কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী সুনাই নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে বালু লুটের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র প্রশাসনের চোখের সামনেই প্রতিদিন নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পাচার করছে, আর এতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ড্রেজার ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করা হয়। পরে এসব বালু কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ছনবাড়ী সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়। সেখান থেকে ছোট ট্রলি ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে দিনে-দুপুরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে—এই বালুবাহী যানবাহনগুলো নোয়াগাঁও মোড়ে স্থাপিত পুলিশ চেকপোস্ট অতিক্রম করেই চলাচল করছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন শতাধিক ট্রলি চেকপোস্টের সামনে দিয়েই পার হচ্ছে, যা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, চেকপোস্ট থাকার পরও কীভাবে এত বালুর গাড়ি চলাচল করছে, তা বোধগম্য নয়। এটি কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা নয়, এর পেছনে শক্তিশালী প্রভাবশালীদের মদদ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে কিছু ট্রলি জব্দ বা মামলা করা হলেও মূল সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বরং মামলায় শ্রমিক বা নিম্নস্তরের লোকজনকে আসামি করা হচ্ছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আড়াল করার কৌশল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে। না হলে দিনের আলোতে এভাবে বালু লুট সম্ভব নয়।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন Legal Initiative for Forest and Environment (লাইফ)-এর সভাপতি এম.এ আলী বলেন, সুনাই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুধু একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি একটি গুরুতর পরিবেশগত বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং তীরবর্তী জনপদের নিরাপত্তা—সবকিছুই এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে।

আমরা লক্ষ্য করছি, প্রশাসনিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে যে, কার্যকর তদারকি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আমিরুল বলেন, আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে। আমি থাকাকালীন কোনো গাড়ি আমার সামনে দিয়ে যায় না। তবে কিছু বিকল্প রাস্তা থাকতে পারে, সেগুলো ব্যবহার করে গাড়ি চলাচল করতে পারে।

অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধের দায়িত্ব মূলত ভূমি প্রশাসনের। তারা সহযোগিতা চাইলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) পলাশ তালুকদার জানান, এর আগেও অভিযান চালানো হয়েছে। নতুন করে বালু উত্তোলনের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে সচেতন মহলের মতে, সুনাই নদীর দুই পাড় দুই প্রশাসনিক এলাকায় হওয়ায় সমন্বয়ের অভাবকে পুঁজি করে সিন্ডিকেটটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তারা বলছেন, নোয়াগাঁও ও ছনবাড়ী এলাকায় মজুদকৃত বালু জব্দ এবং সিন্ডিকেটের নেপথ্যের প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে এই লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব নয়।

এদিকে অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, ভাঙন বৃদ্ধি ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.




© All rights reserved ©ekusheysylhet.com
Design BY DHAKA-HOST-BD
weeefff